নিউক্লিয়ার এনার্জির সাতকাহন
নিউক্লিয়ার এনার্জি কী ?
বর্তমান সময়ের আলোচিত একটি শক্তি হচ্ছে নিউক্লিয়ার এনার্জি বা পরমানু শক্তি। প্রযুক্তিগত দিক থেকে অন্যান্য শক্তির উৎসগুলো থেকে নিউক্লিয়ার এনার্জি কিছুটা আলাদা। কারণ এই শক্তি আসে পদার্থের একেবারে কেন্দ্রস্থল নিউক্লিয়াস থেকে। নিউক্লিয়াস থেকে পাওয়া যায় বলে এই শক্তির নাম নিউক্লিয়ার এনার্জি।
এই নিউক্লিয়ার প্রযুক্তির মূলে রয়েছে নিউক্লিয়ার ফিশান বিক্রিয়া যার মাধ্যমে পরমাণু ভেঙ্গে যায়। প্রতিটি পরমাণুর মাঝে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত থাকে। ১৯৩৪ সালে ইতালির বিজ্ঞানী ফার্মি লক্ষ্য করলেন অধিকাংশ ভারী মৌলের (যেমন- রেডিয়াম, ইউরেনিয়াম প্রভৃতি) কেন্দ্রে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করলে কেন্দ্রাংশটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি (যেমন- তাপ, আলো, তড়িৎ চুম্বকীয় শক্তি) নির্গত হয়। এই প্রক্রিয়াটিই নিউক্লিয়ার ফিশান নামে পরিচিত। আর এই ফিশান বিক্রিয়ার মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায় তাই হলো নিউক্লিয়ার এনার্জি। নতুন নিউট্রনগুলো আবার নতুন পরমাণুকে আঘাত করে। এ বিক্রিয়াটি ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ মৌলের মজুদ শেষ না হয়। বিক্রিয়াটি চেইন বা শিকল আকারে চলতে থাকে। তাই এ বিক্রিয়াকে উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ বিজ্ঞানের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ E=mc2 থেকেও বের করা যায়।

আলবার্ট আইনস্টাইনের এই বিখ্যাত সমীকরণে, ‘E’ হলো উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ, ‘m’ হলো পদার্থের ভর, আর ‘c’ হলো আলোর গতিবেগ। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, নিউক্লিয়ার চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে খুব অল্প পরিমাণ পদার্থ থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি পাওয়া সম্ভব। যখন ১ পাউন্ড ট-২৩৫ বিভাজিত হয় তখন বিভাজিত টুকরোগুলো এবং যুক্ত নিউট্রনের মোট ভর হয় ০.৯৯৯ পাউন্ড। অর্থাৎ বাকি ০.০০১ পাউন্ড পদার্থ পরিণত হয় শক্তিতে। এই শক্তি ১১ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ শক্তির সমতুল্য। এই সমপরিমাণ শক্তি পেতে আমাদের দেড় হাজার টন কয়লা কিংবা দুই লাখ গ্যালন গ্যাসোলিন পোড়াতে হবে।
নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর
নিউক্লিয়ার ফিশান বিক্রিয়া যে বিশেষ ধরনের রিয়েক্টরে সম্পন্ন হয় তা নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর বা পারমাণবিক চুল্লি নামে পরিচিত। নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর সাধারণত বেলন আকৃতির ঘরের মতো। এক একটি নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরের আয়তন এবং উচ্চতা সাধারণত বিশাল হয়। নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরের উচ্চতা প্রায় ৫-১০ তলা বাড়ির উচ্চতার সমান আর ব্যাসার্ধ প্রায় ৫ মিটার। এসব নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইউরেনিয়াম (বা প্লুটোনিয়াম) রড। এটি ‘ফুয়েল রড’ নামেও পরিচিত। প্রকৃতিতে যে ধরনের ইউরেনিয়াম পাওয়া যায় তাতে U-235এবং U-238 থাকে। তবে নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরে অধিক ট-২৩৫ সমৃদ্ধ জ্বালানী ব্যবহার করা হয়।কৃত্রিমভাবে U-238 আইসোটোপ থেকে তেজস্ক্রিয় Pu-239 প্রস্তুত করা সম্ভব যা U-235 এর বিকল্প জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইউরেনিয়ামের পরমাণু কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসে আছে প্রোটন এবং নিউট্রন। এর পরমাণুর নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব কম থাকায় তা ভেঙ্গে নিউট্রন বের হয়। এই নিউট্রন আবার অন্য ইউরেনিয়াম পরমাণুকে আঘাত করে। আর এভাবেই উৎপন্ন হয় বিপুল পরিমাণ শক্তি। নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরের মধ্যে নল দিয়ে পানি প্রবেশ করানো হয়। ফিশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপে এই পানি ফুঁটে বাষ্পে পরিণত হয় যা অন্য আরেকটি নলের মাধ্যমে বের হয়ে আসে। সাধারণত ১ কেজি U-235 থেকে প্রায় ১৮.৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা তাপশক্তি পাওয়া যায়। সতর্কতা হিসেবে নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরের দেয়াল খুব পুরু (বিশুদ্ধ গ্রাফাইটের আস্তরণ দ্বারা) করা হয় যেন তা নিউট্রন বা গামা রশ্মি শোষন করতে পারে।

পুরো ফিশান বিক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিভিন্ন দেশে এখন নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরে ফুয়েল রড পাল্টাতে রোবট ব্যবহার করা হয়।
বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর রয়েছে। যেমন-
১. লাইট এন্ড হেভি ওয়াটার রিয়েক্টর
২. প্রোপালশন রিয়েক্টর
৩. ব্রিডার রিয়েক্টর
৪. পুল টাইপ রিয়েক্টর
৫. বয়েলিং ওয়াটার রিয়েক্টর
বিশ্বের প্রথম নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর
পৃথিবীর প্রথম নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর তৈরি করেছিলেন ইতালির বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি। এর নাম ছিল ‘অ্যাটমিক পাইল’। এই অ্যাটমিক পাইলে ব্যবহার করা হয়েছিল ২২,০০০ টুকরো ইউরেনিয়াম অক্সাইড এবং ৪০০,০০০ পাউন্ড গ্রাফাইট।ফার্মির তৈরি ‘অ্যাটমিক পাইল’ ১৯৪২ সালের ২ ডিসেম্বর শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে বসানো হয়েছিল। ফার্মির তৈরি নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর আর বর্তমান যুগের নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরগুলোর কার্যনীতি প্রায় একই। তবে সময়ের হাত ধরে বর্তমান সময়ের নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর অনেক উন্নত এবং আধুনিক।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের কার্যনীতি
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়ার ধাপগুলো হলো-
১. নিউক্লিয়ার রিয়েক্টেরে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণ তাপশক্তি উৎপন্ন হয়।
২. এই তাপশক্তির মাধ্যমে পানিকে উত্তপ্ত করে বাষ্পে পরিণত করা হয়।
৩. এই বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে গতিশক্তি পাওয়া যায়।
৪. টারবাইনের মাধ্যমে প্রাপ্ত গতিশক্তি দিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের সুবিধা
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের সুবিধাগুলো হলো-
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের খরচ খুব একটা বেশি নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচের চেয়ে কম।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টে অল্প পরিমাণ জ্বালানী দিয়েই বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা যায়। এক টন কয়লা থেকে যে পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায় ১ গ্রাম ইউরেনিয়াম থেকে সেই পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায়।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের প্রযুক্তি অন্যান্য পাওয়ার প্লান্টের প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টে উৎপাদিত বর্জ্যরে পরিমাণ তুলনামূলক কম।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট পরিবেশ বান্ধব। কারণ এতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সহ অন্যান্য গ্রীণ হাউজ গ্যাস উৎপন্ন হয় না।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের অসুবিধা
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের অনেক সুবিধা থাকলেও এর কিছু অসুবিধাও রয়েছে। যেমন-
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের উৎপাদিত বর্জ্যরে পরিমাণ তুলমানূলক কম হলেও এর বিষাক্ততা অনেক বেশি।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের দূর্ঘটনা হলে এর ভয়াবহতা হয় অনেক বেশি মারাত্মক। তাই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের সময় দূর্ঘটনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়।
নিউক্লিয়ার এনার্জি : বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা না হলেও বাংলাদেশে একটি রিসার্চ নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর রয়েছে। বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার এনার্জি বিষয়ক গবেষণা করছে বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন। আর এই একমাত্র নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরটি ১৯৮৬ সালে সাভারের গণকবাড়িতে স্থাপন করা হয়। ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম এই নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরটির নাম TRIGA Mark II। এছাড়াও ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত অ্যাটমিক এনার্জি সেন্টারে ৩ মেগা ইলেকট্রন ভোল্টের Van de Fraff accelerator (VDG) স্থাপিত হয়েছিল। নিউক্লিয়ার এনার্জি বিষয়ক গবেষণায় ব্যবহারকারী এরকম accelerator স্থাপনের ঘটনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এটাই ছিল প্রথম। এর ফলে নিউক্লিয় পদার্থ বিদ্যা গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এ অঞ্চলে একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। এই accelerator এর মাধ্যমে বিভিন্ন শক্তির প্রোটন, নিউট্রন ও ডিওটেরন কণিকা নানা নিউক্লিয়াসের উপর প্রক্ষেপন করে বিভিন্ন nuclear section পরিমাপ করা হয় এবং ঐ সংক্রান্ত ডাটা ভিয়েনার ডাটা ব্যাংকে সংযোজন করা হয়।

এছাড়াও ষাটের দশকে পাবনার রূপপুরে নিউক্লিয়ার প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এ পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। তবে হয়তো নিউক্লিয়ার এনার্জি নিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে উঁচুমানের গবেষণা সম্ভব হবে কারণ, এদেশের বিভিন্ন স্থানে তেজস্ক্রিয় বালুর সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব তেজস্ক্রিয় বালুতে জিরকন, থোরিয়াম, ইউরেনিয়াম সহ বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় মৌল রয়েছে।
নিউক্লিয়ার এনার্জির ভবিষ্যত
বর্তমানে সারা বিশ্বে নিউক্লিয়ার এনার্জিকে কাজে লাগিয়ে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৬% পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। নিউক্লিয়ার এনার্জি ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বর্তমানে ফ্রান্সের ৭৫%, যুক্তরাজ্যের ১৫% এবং আমেরিকার ১৫% বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করছে। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় চারশ’র মতো নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট রয়েছে। এর মধ্যে একশটিরও বেশি রয়েছে আমেরিকাতেই। সম্প্রতি MIT- -এর গবেষকরা এক গবেষণায় দেখেছেন-২০৫০ সালে পৃথিবীর বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে হয়তো বড় ভূমিকা পালন করবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টই। পরিবেশ বান্ধব এবং অধিক নির্ভরযোগ্য হবার কারণে এর গ্রহণযোগ্যতাও আরো বাড়বে। হয়তো আমাদের দেশেও বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে একদিন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপিত হবে। নিউক্লিয়ার এনার্জি যেমন হয়ে উঠতে পারে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে কার্যকরী অস্ত্র, তেমনি হয়ে উঠতে পারে মানব সভ্যতা ধ্বংসকারী এক ভয়াবহ অস্ত্র। নিরপত্তার খোঁড়া অজুহাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ শত শত কোটি ডলার খরচ করে তৈরি করছে এসব মারণাস্ত্র। এসব বন্ধ না হলে আমাদের এই সবুজ পৃথিবী পরিণত হবে এক নির্জীব গ্রহে… যেখানে থাকবে না কোনো প্রাণের স্পন্দন।



Very good article. I love it. Thanks for putting out such an informative article.
thanks for the comment